স্যালুট ড. জাফরুল্লা ও মহাব্বত আলী

256

এম এস দোহা

ভাবছিলাম কিছু লিখবো না। ঈদুল ফিতর উৎসবের মাঝে সোস্যাল মিড়িয়ায় প্রত্যক্ষ করলাম করোনাযুদ্ধে দু’জন নিবেদিত প্রাণ কর্মীর ইতিবাচক স্বরূপ। তাই কিছু একটা লেখার লোভ সামলাতে পারলামনা। অবশ্য করোনাকালীন সময় অনেকগুলো নিবন্ধ লেখার সুযোগ হয়েছে আমার। লকডাউনকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
প্রসংঙ্গত সাধারণত মানুষের মৃত্যুর পর তার গুণাবলী প্রকাশ পায়। এখন দেখলাম, প্রিয় মানুষদের করোনা পজেটিভে শুভকাঙ্খীদের অন্তর নিংড়ানো ভালবাসা। অনেকের ধারণা করোনা আক্রান্ত হওয়াটা অনেকটা মৃত্যুর কাছাকাছি। সামাজিক দূরত্ব বাজায়ের কথা বললেও সোস্যাল মিড়িয়ায় সহানুভূতি প্রকাশের অভিমতগুলো কি তা বলছে ? কারণ শারীরিক দূরত্ব¡ বজায় রেখেই আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনেক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছি।
প্রথমত বলছি- করোনা কীট আবিষ্কার নিয়ে দেশব্যাপী বহুল আলোচিত ড. জাফরুল্লা চৌধুরীর কথা। আমার খুব ঘনিষ্ট ও আপনজনদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বয়স ৮০। দুটি কিডনী অকেজো। সপ্তাহে তিন দিন নিতে হয় ডায়লসিস। কিন্তু দেখে বুঝার সুযোগ নেই। সর্বদা উদ্যোগী ও লড়াকু মনোভাব। কিন্তু নিজের প্রতিষ্ঠানের র‌্যাপিড কীটের পরীক্ষায় তার কোভিড-১৯ পজেটিভ। মুক্তিযুদ্ধ জয়ী এই বীরের আত্মবিশ্বাস সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়াবী কোন মোহ কখনোই ছিলোনা তার। বললেন আরো কিছুকাল বাঁচতে চান। অন্তত: করোনা সম্মূখযুদ্ধ মোকাবেলার সুযোগটা আল্লাহ কাছে প্রার্থনা করেন তিনি।
দ্বিতীয় ঘটনাটি লাকসামে। তরুণ ও উদীয়মান রাজনৈতিক কর্মী মহাব্বত আলী। লাকসামের বাসিন্দা হিসেবে বিভিন্ন প্রয়োজন ও সময়ে তার সান্নিধ্যে গিয়ে অনেক ইতিবাচক দিক উপলব্ধি করেছি কাছ থেকে। বড় ভাই হিসেবে যতটুকু শ্রদ্ধা ও সম্মান পাওয়ার কথা তা নিশ্চিত করেন তিনি। মাননীয় এলজিআরডি মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলামের হাতধরে রাজনৈতিতে পদচারনা তার। কিন্তু ইতিমধ্যে নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মকান্ড ও গুণাবলীতে মহিমান্বিত তিনি। লাকসাম পৌর আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ের মণিকোটায়। চলমান করোনা যুদ্ধে ছিলেন মাঠে। রেখেছেন ইতিবাচক ভূমিকা। অথচ ঈদের দিনেই খবর এলো তিনি কোভিড-১৯ পজেটিভ।
এই দু’জন ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হওয়ায় ঘটনা থেকে আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, কোভিড-১৯ পজেটিভ হওয়াটা অপরাধ নয়। সর্দি, কাশি ও জ্বরের রোগীদের ঘৃণা, অবহেলা, অবজ্ঞা করাটা অমানবিক। করোনাকালে মৃত লাশের দাফন ও সৎকারে প্রয়োজন সংবেদনশীলতা। অথচ এধরনের অমানবিক ঘটনা মিড়িয়ায় আসছে প্রতিদিন।
এপ্রসঙ্গে করোনা আক্রান্ত একজন চিকিৎসকের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার হামিদা মুস্তফা সেঁওতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ায় লোকজনের অসামাজিক আচরণে রাতের অধারে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন ময়মনসিংহের চড়পাড়া নয়াপাড়া এলাকায় স্বামীর ভাড়া বাসায়। সেখানেই কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন তিনি। তার স্বামীও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীদের কথাবার্তা ও আচার-আচরণে মানসিকভাবে দারুণ মর্মাহত হন এই দম্পতি। মনের দুঃখ ও কষ্টে ফেসবুকে ডাঃ সেঁওতি এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। যা মূহুর্তেই ভাইরাল হয়।
স্ট্যাটাসে ডাঃ সেঁওতি বলেন, ‘সবাই বলছে কাউকে বলো না। কেন বলব না? না বললে আমার দ্বারা অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারে। আমি তো কোনো দোষ করিনি। আমি আপনাদের সেবা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছি। লকডাউনে যখন আপনারা বাড়িতে বসে সময় কীভাবে কাটাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তা গ্রস্থ। তখন আমি হয়তো কোনো কভিড-১৯ পজিটিভ ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে। হ্যাঁ, আমি হয়তো কভিড-১৯ পজিটিভ। এতে আমার কোনো লজ্জা বা ভয় বা আফসোস নেই। বরং আমি খুব গর্বিত। কারণ আমি শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে এসেছি। এখন যদি মরেও যাই আমার আফসোস থাকবে না। কারণ, আমি ডাক্তার হিসেবে যে শপথ নিয়েছিলাম তা পালন করে এসেছি। আমি যত দিন পেরেছি আপনাদের জন্য হাসপাতালে এবং মাঠে কাজ করেছি।’ অতপর ওই দম্পতির করোনা পরীক্ষায় রেজাল্ট ‘ নেগেটিভ’ আসে।
উপসংহারে ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মহাব্বত আলীকে বলতে চাই। আপনাদের কোভিড-১৯ পজেটিভ রিপোর্টে আমরা গর্বিত। কারণ অনেকের মতো ঘরে নিজেদের গুটিয়ে না রেখে আপনারা ছিলেন মাঠে-ময়দানে ও জনকল্যাণে। নিশ্চয় সৃষ্টিকর্তা আপনাদের কল্যাণ নিশ্চিত করবেন। স্যালুট আপনাদের।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট