সুদ ব্যবসায়ীদের পরিনতি

23

মাওলানা আবুল বাশার: মানবতার কল্যাণময়ী একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ইসলাম শোষণমুক্ত এক নিরুপম সমাজ ব্যবস্থার নাম। আর সুদ সমাজে শোষণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। এর আরবি শব্দ “রিবা”। অভাবীমানুষকে ঋণপ্রদানের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার নামই রিবা বা সূূদ। এ রিবা সমাজের অভাবী মানুষকে গভীর অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। তাই আল্লাহ তায়ালা মানবতা বিরোধী এ রিবাকে চিরতরে হারাম করেছেন।
রিবা দুই প্রকার ১. রিবাল ফাদল তথা সমজাতীয় বস্তুর বিনিময়ে অধিক গ্রহণ করা ২.রিবান্নাসিয়াহ বা সময়ের বিনিময়ে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা। বর্তমানে ইসলামী শরীয়াবিরোধী অর্থব্যবস্থায় রিবান্নাসীয়া তথা সময়ের বিনিময়ে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা এর প্রচলন সর্বাধিক। কুরআনে সরাসরি এ সুদের ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।

কুরআনের আলোকে সুদের ভয়াবহতা
ইসলামে সুদ সম্পুর্ণ হারাম ও অন্যতম কাবীরা গুনাহ। কুরআন ও হাদীছে কঠিনভাবে সুদকে হারাম করা হয়েছে। সুদের যাবতীয় প্রকার-প্রকৃতি ও যে নামেই ব্যবহার করা হোক তা নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পার এবং তোমরা সেই আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের, যাতে তোমাদেরকে দয়া করা হয়। সূরা ইমরান্ ১৩০-১৩২। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত ও বিকশিত করেন। আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞ দুষ্কৃতকারীকে পছন্দ করেন না। সূরা বাকারাহ-২৭৬। সুদের টাকায় বরকত কমে যায়, আল্লাহ বলেন, যে সুদ তোমরা দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের সম্পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তা বাড়ে না। আর যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকো, তা প্রদানকারী আসলে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করে। সূরা রূম-৩৯। কেহ সুদে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে কিভাবে উদ্ধার হবে, তা দিকনির্দেশনায় আল্লাহ বলেন। হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং লোকদের কাছে তোমাদের যে সুদ বাকি রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও, যদি যথার্থই তোমরা ঈমান এনে থাকো। সূরা বাকারাহ-২৭৮
কিন্তু যদি তোমরা এমনটি না করো তাহলে জেনে রাখো, এটা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এখনো তাওবা করে নাও এবং সুদ ছেড়ে দাও। তাহলে তোমরা আসল মূলধনের অধিকারী হবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপর জুলুম করাও হবে না। সুরা বাকারা ২৭৯।
যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এই অবস্থায় উপনীত হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে ‘ব্যবসা তো সুদেরই মতো।’ অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। কাজেই যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুদখোরী থেকে সে বিরত হয়, সে ক্ষেত্রে যা কিছু সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই, এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে। আর এই নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল। সূরা বাকারাহ-২৭৫। এ আয়াতে সুদখোরদেরকে পাগল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুদ গ্রহণ করার কারণে শয়তান তাদেরকে মাতাল করে দেয়। কারণ এ সব সুদখোররা মানুষের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতাতো দূরের কথা বরং সুদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

হাদীসের আলোকে সুদের প্রতিফল
হজরত জাবির রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল সা.সুদ গ্রহীতা, দাতা ও সুদি কারবারের লেখক এবং সুদি লেনদেনের সাক্ষী সবার ওপর লানত করেছেন। মুসলিম-৪১৩৮। হাদীসে এসেছে ‘সুদের সত্তরটি স্তর রয়েছে। সবচেয়ে নিন্মটি হলো নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করা’; ‘জেনেশুনে এক দিরহাম পরিমান সুদ খাওয়া আল্লাহর নিকট ছত্রিশ বার ব্যভিচারের চাইতেও অধিক গুনাহের কাজ।’
সামুরা ইবনে জুনদুব রা.থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘আজ রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, দু’ব্যক্তি আমার নিকট এসে আমাকে এক পবিত্র ভূমিতে নিয়ে গেল। আমরা চলতে চলতে এক রক্তের নদীর কাছে পৌছলাম। নদীর মাঝখানে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। আরেক ব্যক্তি নদীর তীরে, তার সামনে পাথর পড়ে রয়েছে। নদীর মাঝখানের লোকটি যখন বের হয়ে আসতে চায় তখন তীরের লোকটি তার মুখে পাথর খন্ড নিক্ষেপ করে তাকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এভাবে সে যতবার বেরিয়ে আসতে চায় ততবারই তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করছে আর সে স্বস্থানে ফিরে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ কে? সে বলল, যাকে আপনি রক্তের নদীতে দেখছেন, সে হল সূদখোর। বুখারি ১৯৫৫।
হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মিরাজের রাতে আমি এমন এক গোত্রের পাশ দিয়ে গমন করি, যাদের পেট ছিল ঘরের মত বড়, যার মধ্যে বিভিন্ন রকম সাপ বাহির থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হল সূদখোর। ইবনে মাজাহ-২২৭৩। রাসুল সাঃ এর পক্ষ থেকে এত বড় হুঁশিয়ারি আসার পরও আজ আমরা এ জঘন্য অপরাধ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছি না। অথচ সুদ দেয়া ও গ্রহণ করা একটি হারাম এবং চরম ঘৃণিত কাজ। পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে সুদ সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে।
সুদের হুকুম
সকল আলেম একমত, সুদ হারাম তা যে কোন প্রকারের সুদই হক না কেন। তবে কিছু পাশ্চাত্যপন্থি আলেমদের মতে, মূলধনের পরিমাণের অধিক লাভ করা নিষেধ। মূলধনের পরিমাণের নিচে রিবা জায়েয। তারা বলেন, জাহিলী যুগে ও রাসুলের যুগে ( দুয়ূনুল ইসতিহলাক) ব্যয় করার জন্য ঋণ গ্রহণ করতো। গরিব লোক ঋন গ্রহণ করে ব্যয় করার পর ফেরত দিতে সামর্থ হতো না, কাজেই শুধু ব্যয় করার জন্য যে মাল নেয়া হয় তার বিনিময়ে রিবা নিষেধ। আর (দুয়ূনুল ইসতিসমার) তথা ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্য নেয়া ঋণকৃত অর্থে রিবা গ্রহণ জায়েজ। কেননা ধনীরা এ কাজটি করে। আর ব্যবসা করার পর আংশিক লাভ প্রদানে ক্ষতি হয় না। তারা দলীল হিসাবে সূরা আল ইমরানের ১৩০ নং আয়াত পেশ করেন। হে ঈমানদারগণ! চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খাওয়া বন্ধ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে। এ শ্রেণির আলেমরা বলেন, স্বল্প পরিমাণে রিবা হারাম নয়। বাস্তব কথা হলো বা জমহুরদের কথা হলো, ব্যবসায়ের জন্য গৃহীত ঋণের অর্থ ধ্বংস হলে ঋণদাতা দায়িত্ব নেয় না। কাজেই ঋণগ্রহীতা এ প্রকারের ঋণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। আর জাহেলী যুগে সকল প্রকারের রিবা চালু ছিল।
অতএব, সুদ দরিদ্রদের জন্য মারণাস্ত্র । বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মানের লক্ষ্যেই ইসলামী আইনে এ রকম ব্যবস্থা চিরতরে হারাম করে দেওয়া হয়েছে।

লেখক: সিনিয়র আরবি প্রভাষক,পরতি ফাযিল ডিগ্রি মাদরাসা।