লাজফার্মায় নকল ওষুধের কারবার

192

মডেল ফার্মেসিখ্যাত লাজফার্মা। অথচ প্রতিষ্ঠানটি জড়িয়ে পড়েছে নকল ওষুধের কারবারে। করোনাকালেও অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রির দায়ে জরিমানা গুনতে হয়েছে তাদের। এর আগেও নকল ওষুধ রাখার দায়ে শাস্তি পেতে হয়েছিল ওষুধ বিক্রিকারী বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠানকে। প্রশ্ন উঠেছে, যে প্রতিষ্ঠান দিনে কোটি টাকার বেশি ওষুধ বিক্রি করে তাদেরকে কেন অবৈধ ওষুধ রাখতে হবে। বিক্রি করতে হবে? দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব ওষুধ বিক্রিতে লাভের অঙ্কটা অনুমোদিত ওষুধের চেয়ে বেশি। চিকিৎসকরাও নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এগুলো রোগীদের নির্দেশনাপত্রে লিখেন।

সম্প্রতি উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে নকল ওষুধ তৈরির খোঁজ পায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। লাজ ফার্মাসহ বেশ কয়েকটি ফার্মেসি এসব নকল ওষুধ বিক্রি করে আসছে।

লাজ ফার্মার উত্তরা শাখায় অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন ওষুধ রাখার দায়ে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই জায়গায় তামান্না ফার্মেসিকে একই অভিযোগে এক লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে।

৯ই জুলাই রাজধানীর উত্তরায় অভিযান চালায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগ। আমেরিকা, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ওষুধ কোম্পানির মোড়কে ভেজাল ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করছে চক্রটি। এই ওষুধ তৈরির বিভিন্ন উপকরণ টঙ্গী, ফকিরাপুল ও মিটফোর্ড থেকে সংগ্রহ করার খোঁজ পায় গোয়েন্দা পুলিশ। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির উপকরণ। পুলিশ বলছে, আল মদিনা, ইসলামিয়া এবং তামান্না ফার্মেসিও এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অভিযানে অরেক্সিস, হাইজিংক, ডায়ানাসহ ৬টি বিদেশি ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির উপকরণ জব্দ করা হয়। আটক করা হয় ১৯ জনকে। তারা আটা-ময়দা আর রং মিশিয়ে এসব ওষুধ তৈরি করে এগুলো প্যাকেট করে বিক্রি করে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসব ওষুধ সামগ্রী আমদানি হয় না। নকল কারখানার মালিকরা বিভিন্ন এলাকায় বিক্রয় প্রতিনিধি দিয়ে তাদের উৎপাদিত নকল ওষুধ বিক্রি করে।

অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, তাদের কাছে নকল ওষুধের বিষয়ে তথ্য ছিল। বিষয়টি বেশ কয়েকদিন ধরে নজরে রাখছিলেন। লাজ ফার্মা, মদিনা, ইসলামিয়া এবং তামান্না ফার্মেসি এসব ওষুধ বিক্রি করছে। উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডের ১০নং বাসায় এই নকল ওষুধ তৈরি করা হয়। এতে ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন নেই। লাজ ফার্মা ও তামান্না ফার্মেসিতে নকল ওষুধ রাখার দায়ে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। আটক করা হয় ১৯ জনকে।

লাজ ফার্মার উত্তরা এক নম্বর শাখার বিক্রয় কর্মীরা জানান, নকল ওষুধ রাখার জন্য তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওষুধ বাজারজাতকারী কোম্পানির লোকজনকে পুলিশ আটক করেছে। তবে নকল ওষুধ রাখার জন্য এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে প্রশাসন।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে লাজ ফার্মার পরিচালক সাকিব রহমান বলেন, কেউ যদি নকল ওষুধ তৈরি করে দোকানে বিক্রি করতে দেয় সেটা দেখার বিষয় আমাদের না। আমাদের তো যাচাই-বাছাই করার মেশিন নেই। সেখানে লাজ ফার্মার দোষ কোথায়? আমরা তো দোষ করিনি। দুর্নীতি করিনি। চিকিৎসকরাও এই ওষুধের নাম নির্দেশনাপত্রে লিখে থাকেন। তারা শুধু এস বি করপোরেশনের দেয়া ওষুধ বিক্রি করছেন মাত্র। কোম্পানিটি সরকার থেকে অনুমোদন নিয়ে ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করছে। তারা আমদানি করা ওষুধের পরিবর্তে নিজেরা দেশে ওষুধ বানিয়ে নকল ওষুধ সরবরাহ করছে দোকানে দোকানে। ওষুধের প্যাকিং দেখে কারো বোঝার সাধ্য নেই যে, সেটা নকল। ‘এইচএনএস’ নামের চর্মের ও চুলের নকল ওষুধ রাখার জন্য আমাদেরকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এর আগে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে র‌্যাবের অভিযানে লাজ ফার্মায় ২৪ ধরনের অনুমোদনহীন ওষুধ পাওয়া যায়। দেশি-বিদেশি যেকোনো ওষুধ বিক্রির জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমতি লাগবে। ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষার পর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সব ওষুধের গায়ে একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে থাকে। সেবার অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রির দায়ে রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ ফার্মেসি লাজ ফার্মাকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছিল।

সূত্র: মানবজমিন