রেডিও, টেপ, ভিসিআর

175

মোহাম্মদ আইয়ুব

একটা সময় ছিল যখন রেডিও, ঘড়ি, কলম, চশমা এবং টেপ ফ্যাশনের অংশ। এই তো সে দিন ১৯৮৫ সালের কথা। বাল্য শিক্ষা বই পড়ে মোটামুটি শিক্ষিত গ্রাম্য মোড়ল শ্রেনীর লোকেরা হাতে সিকোফাইভ ঘড়ি, পকেটে একটি ফাউন্টেন পেন, চোখে জিরো পাওয়ারের চশমা দিয়ে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিতেন। গ্রামের চাষা-ভুষারা তাদের সালাম দিয়ে কথা বলত। চা, পান, সিগারেট খাওয়াতো। তারা পুঁথি পাঠ করতেন। রেডিওতে যখন সংবাদ পাঠ করা হতো, তখন চট করে তারা হাতের সিকোফাইভ ঘড়ির টাইম মিলিয়ে নিতো। এটাকে রেডিও টাইম বলতো। বাল্য শিক্ষা বই পড়ে এরা শিক্ষিত হলেও এই যুগের A+ পাওয়া উচ্চ শিক্ষিতদের চেয়ে কম জ্ঞানী ছিলেন না। দেশ-বিদেশের খবর তারা রাখতেন। অনেক কঠিন কঠিন ইংরেজী, বাংলা ও সংস্কৃত শব্দের অর্থ তারা অনায়াসে বলতে পারতেন।
দুবাই ও সৌদি আরব থেকে যুবক শ্রেনীর ছেলেরা হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে টাকা পয়সা রোজগার করে দেশে আসত। ফেরার সময় একটি ফাইভ ফোর থ্রী মডেলের অথবা ন্যাশনাল টেপ নিয়ে আসত। সাথে নাইন বল ব্যাটারী। এই টেপের জন্য দর্জির দোকান থেকে আকর্ষণীয় কাপড়ের কভার তৈরী করে নিতো। কভারে ফুল আকৃতির চমৎকার কুচি থাকতো। ক্যাসেট বাক্সের উপরে একটি ঝাপ (ক্যাপ) থাকতো। যাতে ক্যাসেট ঢুকাতে ও বের করতে কভার খুলতে না হয়। ব্যাটারীতে চার্জ দেওয়ার জন্য দোকান ছিল। দোকানের বারান্দায় একটি চৌকি থাকত। চৌকির উপর সারি সারি করে ব্যাটারী গুলো রাখা হতো। ট্যাংকার থেকে চার্জ দিত। একটি ব্যাটারী থেকে অন্য ব্যাটারীতে কলাম লাগানো থাকত।
দুবাই ফেরত যুবকেরা এক হাতে টেপ অন্য হাতে ব্যাটারী নিয়ে লোকজনকে দেখিয়ে ভাব করে গান শুনতো। সেই সময়ের চট্টগ্রামের জনপ্রিয় শিল্পী শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব এবং শেফালী ঘোষের গান বেশি শুনতো।
‘’তুঁই আঁর দোয়ারদি য, আঁর লই হতা ক্যা ন হ”
হন হতার তুন গোসসা অইয় আঁরে বুঝাই হ” তুঁই আঁরে বুঝাই হ …
তখনকার সময়ে এক শিক্ষিত যুবক এই দুবাই ফেরত বাহা (বাহাদুর) যুবকদের বাহাদুরী দেখে ঈর্ষা করে একটি গান লিখেছিল-
দুবাই যাইতো মনে হদ্দে, ক্যানে যাইয়ুম-
আঁই হন্ডে গেলে পয়সা ছাড়া NOC পাইয়ুম।
দুবাই যাইতো মনে হদ্দে, ক্যানে যাইয়ুম …………
ব’র দিন্না সম্পদ বেচি দুবাই যারা যায়-
পাত্তর হংহর ভাংঙ্গি তারা বহুত টিঁয়া পাই
দুবাই, বহুত টিঁয়া পাই….
দুবাই ফেরত হইয়া তারা, সুন্দর সুন্দর বিয়া গইত্য চাই।
দুবাই যাইতো মনে হদ্দে ক্যানে যাইয়ুম ……….
তবে হাজী আহাম্মদুল হক সাহেবের বেলায় কেবল ব্যতিক্রম ছিল। তিনি দীর্ঘ দিন সৌদি আরব প্রবাস জীবনের ইতি টেনে ১৯৮৫ সালে স্ব-পরিবারে দেশে চলে আসেন। আসার সময় ফাইভ ফোর থ্রী কিংবা ন্যাশনাল টেপ আনেন নাই। এনেছিলেন একটি টিভি এবং একটি ভিসিআর। সেই সময়ে টিভি ভিসিআর গ্রাম এলাকায় খুবই দূর্লভ বস্তু ছিল। এই কারণে তিনি ভিসিআর হাজী ও টকি হাজী নামে এলাকার লোকজনের নিকট সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন। হাজী আহাম্মদুল হক নামে তাকে আজ অবদি কেউ চেনে না। তবে ভিসিআর হাজী বা টকি হাজী নাম বললেই কারও চিনতে অসুবিধা হয় না।
৩০/৩২ বছর পর এখন আর সেই বিদেশ ফেরত বাহা যুবকদের হাতে ফাইভ ফোর থ্রী কিংবা ন্যাশনাল টেপ আনতে দেখা যায় না। তবে দু-চারটি দামী মোবাইল, কানে এয়ার ফোন, বুক পর্যন্ত ঝুলানো তার দেখে বুঝতে বাকী থাকে না এই যুবক বিদেশ থেকে এসেছে। তাদের বুক অবদি তার ঝুলানো এয়ার ফোনে গান শোনার সংস্কৃতি আমাদের উঠতি বয়সের ছাত্র-যুবকদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে। ফলে গানে মনোযোগ থাকা অবস্থায় রেল লাইন বা সড়ক-মহাসড়ক পারাপারে শিকার হচ্ছে দূর্ঘটনার। আমাদেরকে অকালে হারাতে হচ্ছে কিছু সম্ভাবনাময় জীবন।
লেখক:
অফিসার ইনচার্জ
লালমাই থানা, কুমিল্লা।