মাউশি ও শিক্ষাবোর্ডের নির্দেশ অমান্যকারী পুনরায় সভাপতি !

ব্রাহ্মনপাড়ার মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়

12

স্টাফ রিপোর্টার : ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বার বার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের নির্দেশ অমান্যকারী, বিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতিসাধনকারী হিসেবে অভিযুক্ত সেই মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীরকেই কুমিল্লার ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি প্রস্তাব করে অনুমোদনের জন্য কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করা হয়েছে।

এদিকে বিধি লঙ্গন করে গঠিত এই কমিটি বাতিলের জন্য গত ১২ জুলাই কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে লিখিত আবেদন করেছেন বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক এডহক কমিটির সদস্য গোলাম সারওয়ার। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, বিধি মোতাবেক বিগত এডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন পূর্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রিসাইডিং অফিসার ২৬ দিন পূর্বে নির্বাচন করেছেন, যা প্রবিধানমালা- ২০০৯ এর ১৮ ধারার লঙ্গন। এছাড়া গঠিত কমিটির সভাপতি মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীর বিদ্যালয়ের সুনাম নষ্টকারী, আর্থিক ক্ষতিসাধনকারী, শিক্ষাবোর্ডের আদেশ অমান্যকারী ও মামলাবাজ। এর আগে দুইবার তাঁর সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি বোর্ড কর্তৃক বাতিল করা হয়েছে। তিনি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

শিক্ষাবোর্ড, বিদ্যালয় ও স্থানীয় অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীর প্রথমবার সভাপতি হয়ে ২০১৭ সালে বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ৮৪জন শিক্ষার্থীকে অবৈধ উপায়ে আর্থিকভাবে লাভবানের আশায় এসএসসি-২০১৮ পরীক্ষার ফরম পূরণের অপচেষ্টা করেন। সেই সময়ে শিক্ষাবোর্ডের হস্তক্ষেপে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ওই ঘটনায় সভাপতি ক্ষুব্ধ হয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে বিধি বর্হিভূতভাবে প্রধান শিক্ষক মোঃ মো: মনিরুল ইসলাম সরকারকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের আবেদনের প্রেক্ষিতে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীরকে প্রথমে কারন দর্শানোর নোটিশ দেন। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ও একাধিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্ণিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০০৯ এর ধারা ৩৮ মোতাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করেন শিক্ষাবোর্ড।
এরপর ২০১৯ সালের মার্চে ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি করে এডহক কমিটি গঠন করা হয়। এডহক কমিটির তত্বাবধানে ২০১৯ সালের ৪ আগষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন হয়। এসময় দ্বিতীয়বার সভাপতি হন মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীর। আবার সভাপতি হয়েই তিনি প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে যোগদান করতে বাধা দেন ও তাঁর বেতন ভাতাদি বন্ধ করে দেন। মাউশি ও শিক্ষাবোর্ডের নির্দেশনা বারবার অমান্য করে প্রধান শিক্ষককে কাজে যোগদান করতে না দেয়া ও বেতন ভাতাদি পরিশোধ না করায় ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি সেই কমিটিও বাতিল করে দেয় শিক্ষাবোর্ড। এরপর ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সামছুল আলমকে সভাপতি ও অভিভাবক সদস্য গোলাম সারোয়ারকে সদস্য করে এডহক কমিটি অনুমোদন দেয় শিক্ষাবোর্ড।

গত ২৩ মে মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অভিভাবক সদস্য, দাতা সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাধারণ অভিভাবক সদস্য পদে ৪জন, দাতা সদস্য পদে ১জন, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ১জন, শিক্ষক প্রতিনিধি পদে ৩জন কে নির্বাচিত ঘোষনা করেন প্রিজাইডিং অফিসার ও ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ ফারুক আহম্মদ। এদিকে গত ২৬ মে প্রিজাইডিং অফিসারের কক্ষে উপস্থিত হয়ে নির্বাচিত সদস্যরা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি পদে অভিযুক্ত মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীরকে মনোনীত করেন। অথচ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্ণিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০০৯ এর ১১ (গ) তে উল্লেখ রয়েছে – “সংশ্লিস্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বিরোধী বা ইহার সুনাম নস্ট হয় এই রূপ কোন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেন অথবা ইহাতে সহায়তা প্রদান করেন এই রূপ ব্যক্তি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হইতে বা সদস্য হিসাবে থাকিতে পারিবেন না।

সদ্য সাবেক এডহক কমিটির সদস্য ও মাধবপুর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি গোলাম সারোয়ার বলেন, মিয়া মোঃ জাহাঙ্গীর গত ৪বছরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষাবোর্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা পরিচালনা করে বিদ্যালয়ের ৩লক্ষ ৭৯ হাজার ৫শ ৫৫ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। তাঁর প্রতিহিংসার কারণে প্রধান শিক্ষকের ২৩ মাসের পূর্ণ বেতন ও ৭ মাসের অর্ধগড় বেতন বাবদ ৮ লক্ষ ৮৮ হাজার ৫শ ৮৯ টাকা এমপিও খাতে ফেরত যায় এবং প্রধান শিক্ষকসহ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা নানামুখী হয়রানীর শিকার হন। এমপিও নীতিমালা- ২০২১ এর ১৮.৫ ধারা অনুযায়ী ফেরত যাওয়া অর্থ বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে প্রধান শিক্ষককে পরিশোধ করতে হবে। এতে বিদ্যালয়টি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় এই কমিটি অনুমোদন না দেয়ার জন্য বোর্ডে আবেদন দিয়েছি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মনিরুল ইসলাম সরকার বলেন, ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনের পর সকল প্রক্রিয়া শেষে সেটি অনুমোদনের জন্য বোর্ডে প্রেরণ করেছি। বোর্ড এখনও কমিটি অনুমোদন করে নাই।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থ্াপনা কমিটির প্রস্তাবিত সভাপতি মিয়া মো: জাহাঙ্গীর বলেন, শিক্ষাবোর্ড ২বার আমার কমিটি বাতিল করেছে সত্য, তবে আমার কোন ভুল ছিল না। এবার আমি নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছি। এছাড়া মামলা বাবদ স্কুল তহবিল থেকে কোন টাকা আমি ব্যয় করিনি। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্য নয়।

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আবদুস ছালাম বলেন, তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ আছে। এই ফাইলটি আইন শাখায় আছে। তারা দেখে আমাকে জানানোর পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো।