বাগমারায় করোনায় নারীর মৃত্যু ও বিভ্রান্তি

185

নাফিউ জামান।। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ মে সোমবার দিবাগত রাত অনুমান ১.২০ টায় পারুল বেগম (৫৫) নামের একজন নারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বাড়ী লালমাই উপজেলার বাগমারা উত্তর ইউনিয়নের উত্তর মনোহরপুর গ্রামে। তিনি পেশায় একজন ফেরিওয়ালা ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ছাড়াও ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে গেছেন। মৃত্যুর সময় স্বামী ফিরোজ মিয়া ও ছোট ছেলে আজাদ হাসপাতালেই ছিলেন বলে জানা গেছে।

করোনায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর সংক্রমণের আশংকায় স্বামী ফিরোজ মিয়া ‘বিবেক’ (করোনায় মৃত্যুবরণকারীর গোসল, জানাজা ও দাফনকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন) সদস্যদের সহায়তা চান। সেকারনে বিবেক এর ৫জন সদস্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে মরহুমের পরিবার ও গ্রামবাসীর সহায়তায় ২৫ মে মঙ্গলবার সকালে গোসল ও জানাজা শেষে মরহুমকে নিজ গ্রাম উত্তর মনোহরপুরস্থ সওদাগর বাড়ীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন।

দাফনকালে মনোহরপুর খানকা শরীফে (মাইজভান্ডারী) রক্ষিত মরদেহ গোসলের খাট সংগ্রহ করেন বিবেক সদস্যরা। সেই খাটে করেই ভিন্ন পথে (একটু ঘুরে ফসলি জমির উপর দিয়ে) মরদেহ নেন কবরস্থানে। এর আগেই ওই গ্রামের আমজাদ আলীসহ ৪জন কবর খনন সম্পন্ন করেন। দাফন পূর্বে বিবেক এর একজন সদস্যের ইমামতিতে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেই জানাজার নামাজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও গ্রামের ৮/১০জন লোক অংশগ্রহন করেন।

২৫ মে মঙ্গলবার বিকাল ৩.৪৩টায় ‘বিবেক’ এর ফেসবুক পেইজ-এ ‘করোনায় মৃতদেহ দাফন নিয়ে গ্রামবাসীর নির্মম ও অমানবিক আচরণ!’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়। মরহুমের বাড়ী লালমাই উপজেলায় হলেও স্ট্যাটাসে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার নাম লেখা রয়েছে। স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়, করোনায় মৃত্যুর খবর শুনে গ্রামের কথিত কর্তারা কবরস্থানের প্রবেশ পথে গতরাতে (২৪ মে রাতে) নতুন করে বেড়া দিয়ে তালা মেরে দিয়েছে। যেন করোনায় মৃত নারীর দাফন করা না যায়। অথচ উল্লেখিত কবরস্থানের প্রবেশ পথটি গত ৩/৪ বছর ধরে একইরকম রয়েছে। পথের দু’পাশের জমির মালিকরা (যাদের দখলে আছে) নিজেদের জমির সীমানায় তথা পথ ঘেঁষে ৩/৪ বছর আগেই বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেড়া দিয়ে রেখেছেন।

সোস্যাল মিডিয়ায় বিবেক এর স্ট্যাটাসটি নজরে আসায় লালমাই উপজেলার বাসিন্দারাও প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকেন। সোস্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়ায় লালমাইবাসীর দাবী, করোনাকালে বিবেক প্রশংসিত কাজ করে যাচ্ছে। তবে যে এলাকায় তারা লাশ দাফন করবে সেই এলাকার উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগ কে অবহিত করেই মানবিক কাজটি করা উচিত। সেক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে কাজটি সম্পন্ন করা সহজ হবে। বিশেষ করে দাফনকাজে কোন বিঘ্ন ঘটলে আইন শৃংখলা বাহিনীর সহায়তা চাওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রশাসনসহ কাউকে অবহিত না করে মসজিদ কমিটির লোকজন ও গ্রামবাসীকে দোষারোপ করে সোস্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দেওয়া কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না।

মরহুমের ভাশুর পুত্র মোঃ ইলিয়াছ লালমাই বার্তাকে বলেন, আমিসহ গ্রামের কয়েকজন মিলে বিবেক সদস্যদের সাথে জানাজার নামাজ শেষে দাফন কার্য সম্পন্ন করি। খাটিয়া নিতে বা লাশ দাফনে গ্রামের কেউ বাঁধা বা খারাপ আচরন করেননি। তবে আমাদের গ্রামের কবরস্থানে যাতায়াতের পথটি অতি সংকীর্ণ।

উত্তর মনোহরপুর সওদাগর বাড়ীর সর্দার আবদুল বারেক লালমাই বার্তাকে বলেন, মনোহরপুর গ্রামের মন্নাব, সঞ্জিব, রাখাল দা ও বিপ্লব কবরস্থানের পথে বেড়া দিয়ে রেখেছেন। লাশের খাটিয়া কবরস্থানে নিতে সমস্যা হয়। তবে করোনায় মৃত পারুল বেগমের লাশ দাফন কে কেন্দ্র করে কোন বাঁধা বিঘেœর ঘটনা ঘটেনি। আমাদের খানকার খাটিয়া দিয়েই লাশ কবরস্থানে নেওয়া হয়েছে। বিবেক যে তথ্য ফেসবুকে পোস্ট করেছে সেখানে অনেক ভুল তথ্য রয়েছে।

লালমাই উপজেলার বাসিন্দা ও সোস্যাল মিডিয়ার সক্রিয় কর্মী প্রবাসী হেলাল তাহের বলেন, বিবেক এর স্ট্যাটাসে অসত্য তথ্য রয়েছে। এতে অর্থমন্ত্রীর নিজ উপজেলা লালমাই কে হেয় করা হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠ তদন্ত প্রত্যাশা করছি।

‘বিবেক’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও কুমিল্লা মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ইউছুফ মোল্লা টিপু  লালমাই বার্তাকে বলেন, বিবেক সদস্যরা লাশ দাফন করতে গিয়ে যেসব সমস্যা দেখেছে তাই ফেসবুকে লিখেছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়নি।

বিবেক’র ফেসবুক পেইজের স্ট্যাটাস হুবহু:-

করোনায় মৃতদেহ দাফন নিয়ে গ্রামবাসীর নির্মম ও অমানবিক আচরণ!
গত রাতে পারুল বেগম(৫৫) স্বামী -মোঃ ফিরোজ মিয়া,গ্রাম -উত্তর মনোহরপুর, ১নং বাঘমারা ইউনিয়ন, সদর (দঃ) উপজেলা, কুমিল্লা।
করোনায় আক্রান্ত হয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মারা যাওয়ার খবর শুনে গ্রামের কথিত কর্তারা কবরস্থানের প্রবেশ পথ গতরাতে নতুন করে বেড়া দিয়ে তালা মেরে দিয়েছে যাতে উক্ত গ্রাম তথা কবরস্থানে করোনায় মৃত্যু হওয়া মহিলাকে দাফন করতে না পারে। এই অবস্থা মরহুমার স্বামী ও ছেলে শুনার পর মরহুমার লাশ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছিল তখন এক লোক ঘটনা দেখে “বিবেক” এর প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান ইউসুফ মোল্লা টিপুকে ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত জানায় এবং সবদিকে সহযোগিতা করার জন্য বলে (উল্লেখ্য যে উক্ত পরিবার খুবই গরীব ও অসহায়) ঘটনা শুনে ইউসুফ মোল্লা টিপু সর্বপ্রকার সহযোগিতার কথা বলে। “বিবেক” এর সদস্যরা তৎক্ষনাৎ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে মরদেহ সংগ্রহ করে মরহুমার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে গ্রামের বিভিন্ন কথিত মানুষরূপী অমানুষদের মন গলাতে পারেনি এমনকি মসজিদ কমিটির লোকজন খাটিয়া পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেয়নি! উপায়ন্তর না দেখে বৃষ্টি ভেজা মেঠোপথ ও ধান ক্ষেতের মাঝ দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার মরদেহ বহন করে অন্যদিক দিয়ে কবরস্থানে প্রবেশ করে মরহুমাকে কবরস্থ করা হয়। আমরা গ্রামের কথিত মানুষরূপীদের কিছু বলবো না শুধু মহান রাব্বুল আল-আমিন এর নিকট দোয়া করি যেন যারা আজ এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন তাদের যেন হেদায়েত করে এবং তাদের যেন শুভবুদ্ধির উদয় হয়।
হে আল্লাহ তুমি মরহুমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করো।