ফ্রী অক্সিজেন সেবায় ‘লালমাইয়ে ৫০ স্বেচ্ছাসেবী’

61

জহিরুল ইসলাম জহির।।
করোনাকালে যখন বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ ঘরে, তখন কুমিল্লার লালমাইয়ের অর্ধশতাধিক অক্সিজেন ফেরিওয়ালা বিনামূল্যের অক্সিজেন সেবা নিয়ে করোনা রোগী বা শ্বাসকষ্ট রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হেল্পলাইনে ফোন আসলেই স্বেচ্ছাসেবীরা অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অক্সিমিটার নিয়ে রোগীদের বাড়ী বাড়ী ছুটছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত ১৯ জুলাই ‘সেভ লালমাই’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লালমাই উপজেলায় প্রথম বিনামূল্যের অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম শুরু করে। ৩৫টি সিলিন্ডার দিয়ে এই পর্যন্ত তারা রোগীর বাড়ী পর্যায়ে অক্সিজেন সেবা দিয়েছেন ৯০ জনকে এবং বাগমারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২১জন করোনা রোগী কে ফ্রী অক্সিজেন সেবা দিয়েছেন। সংগঠনটির প্রধান পরিচালক ইমাম হোসাইন, পরিচালক ইকবাল হোসাইন, মিয়াজী মোঃ রিয়াদ হোসাইন ও সাহাবুদ্দীনসহ এক ডজন স্বেচ্ছীসেবী ২৪ ঘন্টাই প্রস্তুত থাকেন লালমাইবাসীকে অক্সিজেন সেবা দিতে। ইতিমধ্যে তারা বাগমারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট ৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ৫টি পালস অক্সিমিটার অনুদান হিসেবে হস্তান্তর করেছেন।

এছাড়া উপজেলার ভুশ্চি বাজারস্থ মনোয়ারা মেডিকেল হল’র মালিক আবদুল কাদের ৩১টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ক্রয় করে এলাকাবাসীকে অক্সিজেন সেবা দিচ্ছেন। স্বচ্ছল পরিবারের ক্ষেত্রে তিনি অক্সিজেন রিফিল ব্যয় গ্রহন করলেও বেশিরভাগ রোগীই বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা পাচ্ছেন। তিনিও বাগমারা হাসপাতাল কে ব্যবহারের জন্য ৩টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে সার্বিয়া প্রবাসী মিজানুর রহমান বাগমারা সরকারি হাসপাতালকে ১টিসহ মোট ৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিজ এলাকায় অনুদান হিসেবে দিয়েছেন। মেডিকেল হলটির পক্ষে একজন ডিএমএফ চিকিৎসকসহ ৫জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক ২৪ ঘন্টা অক্সিজেন সেবায় কাজ করছেন।

গত ৩০ জুলাই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভুশ্চি অক্সিজেন হোম’ এর ফ্রী অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন লালমাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার অজিত দেব ও লালমাই উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মজুমদার। সংগঠনটির উদ্যোক্তা ওমর ফারুক প্রবাসে থেকেই ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে কার্যক্রম সমন্বয় করছেন। স্থানীয়ভাবে তত্বাবধায়ক হুমায়ুন কবির মজুমদার, আমান উল্যাহ আমান ও আমীর হোসেনের নেতৃত্বে আবু রায়হান, শাহজাহান ও রফিকুল আমিনসহ ১৩ জন স্বেচ্ছাসেবক সক্রিয়ভাবে অক্সিজেন সেবায় নিয়োজিত।

অত্র উপজেলার বাকই উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান আইউব আলীর সহযোগিতায় ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল হক রিয়াদ ও রিফাত মজুমদার ‘অক্সিজেন ফেরিওয়ালা টিম’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সংগঠনটি এই পর্যন্ত ৮টি সিলিন্ডার দিয়ে ২০ জন রোগীকে ফ্রী অক্সিজেন সেবা দিয়েছেন। সংগঠনটির পাশে দাঁড়িয়েছেন ওই এলাকার প্রবাসী ও ব্যবসায়ীসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

‘অক্সিজেন ব্যাক বেলঘর’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল শাহীন। ফ্রী অক্সিজেন সেবা অব্যাহত রাখতে লালমাই উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানসহ অনেকে সংগঠনটিতে অনুদান দিচ্ছেন।

পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়নের শাসনপাড় গ্রামস্থ এ্যাপস আর্দশ পাঠাগার’র প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ আহমেদ সোহেল এর উদ্যোগে ফ্রী অক্সিজেন সেবা দিতে ৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ১০টি অক্সিমিটার ক্রয় করা হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্দীপন বাগমারা’র প্রতিষ্ঠাতা ইউনিভার্সেল কামাল সমাজের বিত্তবানদের ফ্রী অক্সিজেন সেবায় এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে বলেন, আমাদের সংগঠন রক্ত নিয়ে কাজ করে। করোনাকালে ফ্রী অক্সিজেন সেবা কার্যক্রমও শুরু করতেছি।
‘সেভ লালমাই’ প্রধান পরিচালক ইমাম হোসাইন বলেন, লালমাইবাসী কে ফ্রী অক্সিজেন সেবা দিতে আমরা ৩৫ টি সিলিন্ডার ক্রয় করেছি। প্রয়োজনে আরো সিলিন্ডার ক্রয় করবো। কিন্তু এলাকাবাসীকে অক্সিজেনের অভাবে মরতে দিতে পারিনা।

লালমাই উপজেলার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বাগমারা হাসপাতালের আরএমও ডাঃ আনোয়ার উল্যাহ বলেন, ৩ আগষ্ট সকাল পর্যন্ত লালমাই উপজেলায় করোনায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৪শ ৯৫ জন। পজেটিভ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। সরকারিভাবে পরিসংখ্যান না থাকলেও পজেটিভের চেয়ে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু অনেক বেশি। বাগমারা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১৩জন করোনা রোগী। বাকিরা বাড়ীতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো করোনা রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাগমারা হাসপাতালে সরকারিভাবে কোন বরাদ্দ আসেনা এবং সরকারিভাবে অক্সিজেন সরবরাহও হয় না। তারপরও অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম মুস্তফা কামাল এমপি স্যার ও আবুল খায়ের কোম্পানীর উদ্যোগে গত ২৫ এপ্রিল থেকে বাগমারা হাসপাতালে করোনা ইউনিট ও অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম শুরু করা হয়। সেভ লালমাইসহ কয়েকজন প্রবাসী ও সমাজসেবী হাসপাতালে কিছু অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করেছেন। আরো অন্তত ৫০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রয়োজন। অক্সিজেন সেবা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে।

উল্লেখ্য গত ৩১ জুলাই দিবাগত রাত ৪টায় চিকিৎসকের শতচেষ্টার পরও অক্সিজেনের অভাবে লালমাই উপজেলার বাগমারা ২০ শয্যা হাসপাতালে একজন প্রবাস ফেরত যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে বিষয়টি জানতে পেরে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠন ও এই উপজেলার প্রবাসীরা অক্সিজেন সেবায় এগিয়ে আসছেন।