নানা নাতনির বিয়ে; লাকসামের সারোয়ার আটক

1514

জহিরুল ইসলাম জহির ।।  প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের নাম, সীল, কাবিন ব্যবহার করে বৃদ্ধ নানা ও কিশোরী নাতনির বিয়ে পড়ানোর অভিযোগে গোলাম সারওয়ার মজুমদার নামের একজন নিকাহ রেজিষ্ট্রারকে গ্রেফতার করেছে কুমিল্লার লালমাই থানা পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে তাকে কুমিল্লা কোতয়ালী থানা এলাকা থেকে আটক করা হয়। অভিযুক্ত কাজী লাকসাম উপজেলার আজগরা ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রারের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক। এছাড়া বৃদ্ধ বর সামছল হক কে আদালতের মাধ্যমে শ্রীঘরে প্রেরণ করা হয়েছে।

পুলিশ, ভিকটিমের পরিবার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, লালমাই উপজেলার পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়নের পশ্চিম পেরুল গ্রামের ইমান হোসেন ঢাকায় চাকরি করায় গ্রামে বসবাস করা তার পরিবারের দেখাশুনা করতেন পেরুল দীঘিরপাড়ার রিক্সা চালক সামছল হক। ইমান হোসেনের ২য় কন্যা (১৩) স্থানীয় পেরুল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সামছল হক নিজের রিক্সায় তাকে নিয়মিত স্কুলে আনা নেওয়া করতেন। একপর্যায়ে নানা সামছল হক স্কুল ছাত্রীর নাতনির সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন অজুহাতে প্রায়ই তিনি ওই বাড়ীতে রাত্রীযাপন করতেন। এনিয়ে স্থানীয়রা আপত্তি করলে তিনি প্রাপ্ত বয়স হলে কিশোরীর সাথে নিজের ছেলে মনিরের বিয়ে হওয়ার কথা এলাকায় প্রচার করেন।


কিন্তু গত ১০ মে রবিবার সামছল হক সবাইকে হতবাক করে ৫২ বছরের ছোট কিশোরীকে নিয়ে উধাও হয়ে যান। এনিয়ে স্থানীয়দের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ১১ মে সোমবার পেরুল দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান লোকমারফত সামছল হক ও কিশোরীকে ইউপি কার্যালয়ে হাজির করে বিস্তারিত জানতে চান। ওই সময় সামছল হক কিশোরীর প্রাথমিক শিক্ষা সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদ ও বিয়ের একটি কাবিননামা উপস্থাপন করেন। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সনদ ও জন্মনিবন্ধনে তার জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ০২/০২/২০০২ইং। কাবিননামায় দেখা যায়, গত ১০ মে কুমিল্লা সিটি কর্পোশেনের ৭নং ওয়ার্ড এর নিকাহ রেজিষ্ট্রার মুজিবুর রহমান সরকারের কার্যালয়ে ৫লক্ষ টাকা মোহরানায় বই নং ৫৪, পৃষ্ঠা নং ২৮ ও ক্রমিক নং ৪৪০-এ তাদের বিয়ে রেজিষ্ট্রি হয়। এতে সামছল হকের জন্মতারিখ ০৩/০১/১৯৫৫ইং উল্লেখ রয়েছে।

১৪ মে বিকালে কিশোরীর মা তাছলিমা বেগম বাদী হয়ে বৃদ্ধ নানা সামছল হকের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ২/৩জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধন ২০০৩) এর ৭/৩০ ধারায় লালমাই থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে লালমাই থানার এস আই মোশারফ হোসেন সঙ্গীয় ফোর্সসহ অভিযান চালিয়ে উপজেলার পেরুল উত্তরের হরিশ্চর স্কুল সংলগ্ন হাবিব স্যারের ভাড়া বাসা থেকে সামছল হক কে আটক করেন। এসময় পুলিশ তার হেফাজত থেকে ওই কিশোরীকেও উদ্ধার করেন।

১৫ মে দুপুরে কুমিল্লার আমলী আদালত নং ৯ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সামছুর রহমান এর আদালতে কিশোরীর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। একই আদালত বৃদ্ধ নানা সামছল হক কে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

এদিকে নিজের নাম ব্যবহার করার বিষয়টি জানতে পেরে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ৭ নং ওয়ার্ডের কাজী মুজিবুর রহমান উল্লেখিত কাবিননামা তার কার্যালয়ে রেজিষ্ট্রি হয়নি মর্মে গত ১৪ মে কুমিল্লা কোতয়ালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

শুক্রবার দুপুরে লালমাই থানা পুলিশ কোতয়ালী থানা পুলিশের সহায়তায় লাকসামের আজগরা ইউনিয়ন নিকাহ রেজিষ্ট্রার গোলাম সারওয়ার মজুমদার কে কোতয়ালী থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করেন।

লাকসামের আজগরা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি হাজী আবদুল লতিফ বলেন, মাওলানা গোলাম সারোয়ার মজুমদার আজগরা ইউনিয়নের সরকারি নিকাহ রেজিষ্ট্রার। এছাড়া তিনি আমাদের ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। দুই মেয়াদে প্রায় ৮বছর ধরে তিনি এ পদে রয়েছেন।

লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, বৃদ্ধ সামছল হক কে আদালতের নির্দেশে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। আদালত ভিকটিমের জবানবন্দী গ্রহণ করেছেন। প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের নাম, সীল, কাবিন ব্যবহার করে কাবিন সৃষ্টির অভিযোগে গোলাম সারোয়ার মজুমদার নামের একজনকে গ্রেফতার করেছি। তাকে নিয়ে অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।