দেলোয়ার মেম্বারের ৬লক্ষ ৮০ হাজার টাকা কারা নিছে?

হত্যা মামলার আসামীকে ফুলের মালায় বরণ !

726

স্টাফ রিপোর্টার ।।  লালমাই উপজেলার বেলঘর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের ত্রান বিষয়ক সম্পাদক, ১ নং ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার ও ইছাপুরা গ্রামের কৃষক আমান উল্যাহ হত্যা মামলার অন্যতম আসামী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার প্রকাশ দেলু দীর্ঘ ৫ মাস পলাতক থাকার পর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে এলাকায় এসেছেন। গ্রামে ফিরে আসার পর তার সমর্থিত কয়েকজন লোক তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন।
ওই সময় বেলঘর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ‘এসএম কামাল’ নিজের ফেসবুক আইডি থেকে দেলু মেম্বারের ২টি ভিডিও বক্তব্য প্রচার করেন। ভিডিও বক্তব্যে তিনি বলেন, একটা দূর্ঘটনার কবলে দীর্ঘ ৫ মাস আমাকে এলাকার বাহিরে রাখা হয়েছে। দৌলতপাড়ার মত ছোট্ট গ্রামে ৩টি খুন হয়েছে। এলাইছে ৫টি জবাই হয়েছে। এমন পরিস্থিতি হয় নাই। আমার গ্রামের এই সামান্য ঘটনায় (হত্যা মামলা) আমার ৬লক্ষ ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিছে। আমি জামিনে মুক্ত হয়ে এসেছি। আমার ভাইয়েরাও বেরিয়ে আসবে। পাকিস্থানিদের যারা গ্রামে প্রবেশ করিয়েছে একদিন গ্রামবাসী তাদের বিচার করবে।

ভিডিও ২টি ছড়িয়ে পড়ায় সোস্যাল মিডিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে ফুলের মালা পরানো ইছাপুরা গ্রামের মুরব্বীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ ‘এসএম কামাল’ নামীয় আইডিকে মন্দ কথা বলেন। একপর্যায়ে এসএম কামাল ভিডিওগুলো ডিলেট করে দেন।

বেলঘর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল বলেন, আমি কোন সাংবাদিক নই। আমি একজন ফেসবুক কর্মী। দেলু মেম্বার আমাকে বুধবার রাতে ফোন করে বৃহস্পতিবার সকালে ইছাপুরা দোকানের সামনে দেখা করতে বলেছেন। আমি গেলে তিনি ২টি বক্তব্য দেন। আমি এগুলো ভিডিও করে আমার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করি। পরে সোস্যাল মিডিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় আমি ভিডিওগুলো ডিলেট করে দিই। ভবিষ্যতে আমি এমন ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করবো না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেলু মেম্বার আওয়ামীলীগের ইউনিয়ন কমিটিতে রয়েছেন। অথচ জামিনে বাড়ী আসার পর স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিসহ বিএনপি সমর্থিতরাই তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন। এতে রহস্য তৈরি হয়েছে। তাছাড়া ৬লক্ষ ৮০ হাজার টাকা তার কাছ থেকে কারা নিয়েছেন? দলের কেউ? দলের কেউ নিলে তিনি অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম মুস্তফা কামাল এমপিকে বিষয়টি জানানো উচিত। অন্য কেউ হলে তাও তদন্ত করা উচিত। তিনি এতো টাকা কোথায় পেয়েছেন? তার আয়ের উৎস কি?

বিশ্বস্থ সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্ট থেকে জামিনে বাড়ী গিয়ে দেলোয়ার মেম্বার নিহতের পরিবারকে মামলা প্রত্যাহার করতে চাপ দিচ্ছেন। গ্রামের দোকানে বসে বসে মামলার পক্ষের লোকদের হুমকি ধমকি দেন। উপজেলা আওয়ামীলীগের একজন সিনিয়র নেতাও হত্যাকারীদের পক্ষ নিয়ে নিহতের পরিবারের লোক ও নিকটত্মীয়দের ফোন করে মামলা প্রত্যাহারসহ বিষয়টির আপোষ মিমাংসা করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতেছেন। তবে নিহতের পরিবার মামলা প্রত্যাহারে রাজি নয়। পিতা হত্যার বিচারের জন্য সন্তানরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যেতে চান।

উল্লেখ্য লালমাই উপজেলার বেলঘর উত্তর ইউনিয়নের ইছাপুরা গ্রামের কৃষক আমান উল্যাহ’র (৭০) কন্যাকে কিছুদিন ধরে ইভটিজিং করে আসছিলেন বেলঘর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক ও ইউপি মেম্বার দেলোয়ার হোসেন মজুমদারের ছোট ভাই কাঠমিস্ত্রী সোহরাব। গত ১৬ এপ্রিল রাত অনুমান ১১টায় সোহরাব আমান উল্যাহ’র বাড়ীতে গিয়ে তার মেয়েকে ডাকাডাকি শুরু করেন। এসময় আমান উল্যাহ ও তার ছেলেরা চোর চোর বলে চিৎকার দেয়। তাদের চিৎকার শুনে আশেপাশের বাড়ীর লোকজন বেরিয়ে আসে। রাতের অন্ধকারে লাইট দিয়ে খোঁজতে গিয়ে সবাই দেখে সোহরাব বাড়ীর পাশের ধান ক্ষেতে শুয়ে আছে। এসময় ক্ষুব্ধ জনতা তাকে ধরে উত্তম মধ্যম দেয়। এখবর পেয়ে সোহরাবের ভাই দেলোয়ার মেম্বারের নেতৃত্বে ১০/১২জন সন্ত্রাসী রাত সাড়ে ১২টার পর আমান উল্যাহ’র বাড়ীতে হামলা ও ভাংচুর করে।

হামলা করতে আসতেছে শুনে বাড়ীর সকল পুরুষ আগেই বাড়ী ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। পরদিন ১৭ এপ্রিল দুপুরে গ্রামের গণ্যমাণ্যদের আশ্বাসে আমান উল্যাহ বাড়ীতে ফিরে আসে। বিষয়টি জানতে পেরে দুপুর অনুমান ২.৩০টায় দেলোয়ার মেম্বারের নেতৃত্বে তার ভাইয়েরাসহ কয়েকজন ভাড়াটে সন্ত্রাসী আমান উল্যাহ কে বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে যায়। ঘর থেকে বের করার সময় দেলোয়ার মেম্বার আমান উল্যাহকে মাটিতে আঁছড়ে দেয়। এরপর সবাই মিলে তাকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করে ইছাপুরা গ্রামের শহীদের বাড়ীর সংলগ্ন সড়কের পাশে ফেলে দেয়। স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে তাকে শাকেরা বাজারের পল্লী চিকিৎসক শাহজাহানের কাছে নেয়। এরপর লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। এঘটনায় আমান উল্যাহ’র ছেলে আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে ১৭ এপ্রিল বিকালে দেলোয়ার মেম্বারসহ এজাহারভুক্ত ৪জন ও অজ্ঞাতনামা ৭/৮জনের বিরুদ্ধে লালমাই থানায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে হত্যা চেষ্টা, ভাংচুর, চুরি ও মারপিটের ঘটনায় একটি মামলা (নং ২, তাং ১৭/০৪/২০২০ইং) দায়ের করে। অভিযোগের পরপরই পুলিশ আসামীদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করে। ১৮ এপ্রিল শনিবার বেলা অনুমান ১০ টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমান উল্যাহ মারা যায়। খবর পেয়ে শনিবার বেলা ১১টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার প্রশান্ত পাল ও লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আইয়ুব।

পরে লালমাই থানা পুলিশ নিহতের পরিবারের দায়েরকৃত মামলায় ৩০২ ধারা সংযুক্তের জন্য আদালতে প্রতিবেদন প্রেরণ করে। এঘটনায় পুলিশ ১নং আসামীসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও আত্মগোপনে থাকায় অন্যতম আসামী দেলোয়ার মেম্বার কে গ্রেফতার করতে পারেনি। মামলাটির তদন্ত করছেন লালমাই থানার উপ-পরিদর্শক জাকির হোসেন। ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহতের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসেনি।