কুরআন ও হাদীসের আলোকে রোজার ফজিলত

27
মাওঃ আবুল বাশার ।। 
পানাহার, যৌন প্রবৃত্তি, যাবতীয় অশ্লীল ও অপ্রয়োজনীয় কথা কাজ, গালিগালাজ ঝগড়া বিবাদ, গীবত চোগলখুরী ও মিথ্যা বলা ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রাখার নামই হলো সওম বা রোযা।
রমজান মাসে সকল সাবালক মুসলমানদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
‘‘হে মু’মিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়াম ফরজ করা হল, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’’ (আল-বাকারাহ্ঃ ১৮৩)
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমযান মাস শুরু হলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমাদের নিকট এ মাস সমুপস্থিত। এতে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। কেবল বঞ্চিত ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়।
রমযান মাস আসলে রহমতের দরজা খুলে দেয়া হয়—
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন,, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ রমাযান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানগুলোকে শিকলবন্দী করে দেয়া হয়। বুখারি ১৮৯৯,১৮৯৮।
সাওমের গুরুত্ব অপরিসীম, সিয়ামকারীর মর্যাদা ভাবগাম্ভীর্যের প্রশংসা করে রাসুলুল্লাহ সাঃ হাদীসে নব্বীতে উল্লেখ করেন–
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সিয়াম ঢাল স্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মত কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুই বার বলে, আমি সওম পালন করছি। ঐ সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই সওম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের সুগন্ধির চাইতেও উৎকৃষ্ট, সে আমার জন্য আহার, পান ও কামাচার পরিত্যাগ করে। সিয়াম আমারই জন্য। তাই এর পুরস্কার আমি নিজেই দান করব। আর প্রত্যেক নেক কাজের বিনিময় দশ গুণ।
মুসলিম ১৩/২৯, হাঃ ১১৫১, আহমাদ ৭৩০৮)
আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি বললাম যে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে কোন একটি আমলের নির্দেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি সাওমকে আকড়ে ধর যেহেতু সাওম এর কোন বিকল্প নাই। (এ একটি অদ্বিতীয় ইবাদত)।
নাসাঈ (ইফাঃ) হাদিস নম্বরঃ ২২২৭।
সাওম পালনে রয়েছে নিজের জ্ঞান বহির্ভূত সাওয়াব —-
হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, মানুষের প্রতিটি আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিন্তু রোজার বিষয়টা আলাদা। কেননা তা আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করবো। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।
সহীহ মুসলিম ১১৫১
একজন ঘোষণাকারী (ফেরেশতা) কল্যাণের ঘোষণা দিতে থাকে, হাদিসে নব্বীতে এসেছে–
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ শাইতান ও দুষ্ট জিনদেরকে রামাযান মাসের প্রথম রাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং এর দরজাও তখন আর খোলা হয় না, খুলে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। (এ মাসে) একজন ঘোষণাকারী ফেরেশতা ঘোষণা দিতে থাকেন, হে কল্যাণ অন্বেষণকারী!কল্যানের দিকে অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! পাপ থেকে বিরত হও। আর বহু লোককে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে।
ইবনে মাজাহ ১৬৪২। আবদুর রাহমান ইবনু আওফ, ইবনু মাসউদ ও সালমান (রাঃ) হতেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত আছে।
রমজান মাসে রাসুল সাঃ বেশি বেশি দান করতেন,এবং কুরআন তেলাওয়াত করতেন,
হাদিসে রয়েছে,
ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ধন-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমযানে জিবরাঈল (আঃ) যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরাঈল (আঃ) তাঁর সঙ্গে একবার সাক্ষাত করতেন। আর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে কুরাআন শোনাতেন। জিবরাঈল যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি রহমতসহ প্রেরিত বায়ুর চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৯০২
অন্য হাদিসে রয়েছে, ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুল সাঃ যখন রমজান মাস আসতো,তিনি বন্দিদের মুক্তি দিতেন এবং ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিতেন। মেশকাত১৮৬৯
আল্লাহ তায়ালা রোজাদারদের কিয়ামতের দিন পানি পান করাবেন
হযরত আবু মুসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তায়ালা নিজের উপর অবধারিত করে দিয়েছেন যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গ্রীষ্মকালে (রোজা রাখার কারণে) পিপাসার্ত থেকেছে, তিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিন) পানি পান করাবেন।
রোজা জান্নাত লাভে পথ দেখায়
হযরত আবু ওমামা রাঃ হতে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ’র (সাঃ) দরবারে গিয়ে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।
রাসুলুল্লাহ বললেন, তুমি রোজা রাখ। কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম। রাসুল (সাঃ) জবাব দিলেন, তুমি রোজা রাখ। (মুসনাদে আহমাদ ২২১৪৯)
রোযাদার জান্নাতে প্রবেশ করবেন: আবূ হুুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নাবী (সাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ইমান আনে, সালাত কায়িম করে, রমযান মাসের সওম পালন করে, আল্লাহ্ তাঁর সম্পর্কে এ দায়িত্ব নিয়েছেন যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সে আল্লাহর রাস্তায় হিজরাত করুক কিংবা তাঁর জন্মভূমিতে অবস্থান করুক। সহাবীগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই বিষয়টি আমরা লোকদের জানিয়ে দেব না? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ অবশ্যই, জান্নাতে একশ’টি (মর্যাদার) স্তর রয়েছে। এগুলো আল্লাহ্ তাঁর রাস্তায় জিহাদকারীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। প্রতি দু’টি স্তরের মাঝে আসমান ও যমীনের দূরত্ব বিদ্যমান। কাজেই যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন ফিরদাওস জান্নাত চাইবে। কারণ, সেটি হচ্ছে সবচেয়ে প্রশস্ত ও সবচেয়ে উচ্চ জান্নাত। আর দয়ালু (আল্লাহর) আরশটি এরই ওপর অবস্থিত।এই ফিরদাওস থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাগুলো প্রবাহিত।
[বুখারি আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯০৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯১৮)]
রোজাদার বেহেস্তে প্রবেশ করবে রাইয়ান নামক বিশেষ দরজা দিয়ে
হযরত সাহল ইবনে সা’দ রাঃ হতে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন, জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে কেবল রোজাদারগণ প্রবেশ করবেন। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবে কোথায় সেই সৌভাগ্যবান রোজাদারগণ? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অতঃপর রোজাদারগণ যখন প্রবেশ করবে, তখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সহীহ মুসলিম ১১৫২
রোজা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল ও দুর্গ
হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, রোজা হলো (জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ লাভের) ঢাল ও সুরক্ষিত দূর্গ। (মুসনাদে আহমাদ ৯২২৫)
সাওম রোজ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, রোজা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব, আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।
রাসুল (সাঃ) বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদে আহমাদ ৬৬২৬)
রোজাদারের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়
হযরত আবু হুরায়রা রাঃ বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহীহ বুখারি ২০১৪)
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরে ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমাযানে সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে।
[বুখারী (তাওহীদ) অধ্যায়ঃ ৩০/ সাওম,
হাদিস নম্বরঃ ১৯০১, ৩৫।
পরিশেষে যারা সাওম পালন করবে তাদের দুনিয়াতে একটি আনন্দের অনুভূতি রয়েছে, আর আখিরতে রয়েছে চুড়ান্ত প্রতিফল, এরশাদে নব্বী–
হযরত আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, নবীজী (সাঃ) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। যখন সে আনন্দিত হবে-
এক. ইফতারের সময়। তখন সে ইফতারের কারণে আনন্দ পায়।
দুই. যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাত লাভ করবে তখন তার আনন্দ হবে।
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, যখন তার প্রতিপালক রোজার পুরস্কার দিবেন। (সহীহ মুসলিম ১১৫১)
আসুন মাহে রমজানের এ রহমত বরকত ও মাগফিরাত থেকে আমরা বঞ্চিত না হয়।হক সহকারে রোজা আদায় করি।আমিন
লেখক: সিনিয়র আরবি প্রভাষক, পরতি ফাযিল ডিগ্রি মাদরাসা, লালমাই, কুমিল্লা।