ঈদ উল আযহা ও কালাচাঁন’র আত্মকাহিনী

7

শরিফ তানভীর ।। আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন আমি খুব ছোট্ট। আমরা গরীব মালিকের অধীনে ছিলাম। মালিকের ছোট্ট একটি ছেলে ছিলো। সে আমাকে খুব ভালোবাসে,আমার গলায় হাত ভুলিয়ে দেয়, খড় এনে দেয়। আমি ও তাকে ভালোবাসি তার কোলে মাথা রাখি ।তার বাবা মাও আমাকে খুব ভালোবাসে। তারা আমাকে আদর করে কালাচাঁন ডাকে। তারা আমাকে মাঠে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যায়। আমি মনের আনন্দে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করি, ঘাস খাই এমন করে একটি বছর কেটে যায়। এখন আমি বড় হয়েছি, এখন আমাকে মাঠে প্রতিদিন নেয় না। এখন আমি একটু দুষ্টু হয়েছি। তারা আমাকে আর বের করে না। কারণ আমি মানুষকে ভয় দেখাই। এখন আমাকে বেশি করে খাওয়া দাওয়া করানো হয়। প্রতিদিন ছোট্ট বাচ্চাটা আমাকে ভাতের মাড়, খৈল,ভাত খাইয়ে দেয়। প্রতিদিনের মতো আজকেও আমাকে দেখতে এলো মালিক। আজ সাথে দুই -তিন জন লোক ও এসেছে আমাকে দেখতে। তারা তারা বলা বলি করছে এটা মাশাল্লাহ অনেক বড়। এক লাখের উপরে যাবে। প্রতিদিনের মতো আজও আমাকে খাওয়া দাওয়া করানো হলো। আজকে ভদ্র মহিলার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বাচ্চা টা আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে, আর কাঁদছে বলছে মা তোমরা কালাচাঁন কে বিক্রি করিও না। ও আমার কাল্লু। ছেলেটার কান্না দেখে মালিক ও কেঁদে পেলে। কিন্তু সে কি করবে, সে যে গরীব, বাজার থেকে আমার জন্য খাবার বাকি এনেছে, দোকানিকে কথা দিয়েছে গরু বিক্রি করে সব টাকা পরিশোধ করবে। আমাকে যখন বাড়ি থেকে বের করবে মহিলা আঁচলে মুখ বুজে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বাচ্চাটা মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে চিৎকার করে কান্না করছে। আমার দুচোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছে। তাদের ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তারা আমাকে টেনে টেনে বাজারে নিয়ে গেলো, এতো মানুষ আমি কখনো দেখিনি। অনেক মানুষ এসে আমাকে দেখে, আমার সাথে ছবি তুলে। বিকেল ঘনিয়ে আসে তিন চার জন লোক আমাকে খুব পছন্দ করে। তারা আমাকে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকায় কিনে নেয়।
মালিক আমার গলায় হাত ভুলিয়ে দেয়, তাদের হতে আমাকে তুলে দেয়। আর এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বার বার তাকে ফিরে ফিরে দেখি, এমন অনুভব আমার আর কখনো হয়নি। নতুন মালিকরা খুব খুশি, বাজার থেকে বের হওয়ার পর থেকে কতো মানুষ যে জিজ্ঞেস করলো ভাই গরুটার দাম কতো। বাড়িতে আসতেই বাচ্চারা হৈচৈ শুরু করে। বাচ্চারা ঘাস খড় অনেক কিছু আমাকে এনে দেয়। আমার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছিলো না। এইভাবে কয়েক দিন
যায়, আগামীকাল ঈদ সবাই খুশি, এ কয়দিনে তাদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। তারাও আমাকে খুব ভালোবাসে। সন্ধায় বাচ্চারা এ বাড়ি ও বাড়ি দোড়াদোড়ি করে।মেহেদী হাতে লাগায়। সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ বিরাজ করছে। রাত শেষ হয়ে এলো চারদিকে আজান হচ্ছে। সবাই নামাজ শেষ করে আমাকে গোসল করিয়ে ঈদগাহে চলে যায়। নামাজ শেষ করে এসে তারা আমার পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে পেলে। একজন ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে লম্বা একটা চুরি। সবাই আমাকে মাটিতে শুয়ে চেপে ধরে রেখেছে। ইমাম সাহেব আমার গলায় চালিয়ে দেয়। আমি ছটফট করতে করতে একসময় কোরবানি হই।